বুধবার, ১৮ মার্চ ২০২৬, ১০:৩২ অপরাহ্ন
আন্তর্জাতিক ডেস্ক, একুশের কণ্ঠ:: গাজা যুদ্ধের অবসান ঘটাতে নতুন ইসরায়েলি প্রস্তাব মেনে নিতে হামাসের প্রতি আহবান জানিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেছেন, ‘এখন এই যুদ্ধ বন্ধের সময় এসেছে’। একই সঙ্গে গাজায় যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েলের নতুন প্রস্তাব খোলাসা করেন বাইডেন।
শুক্রবার হোয়াইট হাউজে এক বক্তব্যে বাইডেন বলেন, যুদ্ধবিরতির জন্য ইসরায়েল তিন ধাপের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ে ছয় সপ্তাহের একটি ‘পরিপূর্ণ ও সম্পূর্ণ ‘ যুদ্ধবিরতি হবে এবং গাজার জনবহুল এলাকা থেকে ইসরায়েলি সৈন্যদের সরিয়ে নেওয়া হবে। সেখানে মানবিক সহায়তা প্রদান করা হবে এবং একই সাথে দুপক্ষের মধ্যে বন্দি এবং জিম্মি বিনিময় হবে।
এই চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত দুপক্ষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি শত্রুতা বন্ধ এবং গাজায় বড় ধরনের পুনর্গঠনের দিকে এগিয়ে যাবে।
এ সময় বাইডেন বলেন, ‘এটা আসলেই একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। হামাস সবসময় বলে তারা যুদ্ধবিরতি চায়। তাহলে তারা এই চুক্তি মানে কি না সেই বক্তব্য প্রমাণ করার এটি একটি সুযোগ।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, এই যুদ্ধবিরতি গাজায় প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক মানবিক সহায়তা নিয়ে যাওয়াসহ বিপর্যস্ত অঞ্চলগুলোতে আরো মানবিক সহযোগিতা পৌঁছানোর অনুমতি দেবে।
এই চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে পুরুষ সৈন্যসহ জীবিত জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা হবে। এই যুদ্ধবিরতি তখন স্থায়ীভাবে দীর্ঘ শত্রুতার অবসান ঘটাবে।
এই প্রস্তাবে রাজি হতে হামাসকে যারা আহবান জানিয়েছেন তাদের মধ্যে ছিলেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন। তিনি তার এক্স (সাবেক টুইটার) অ্যাকাউন্টে বলেছেন, ‘এই চুক্তি অবশ্যই মেনে নিতে হবে, যাতে আমরা লড়াই বন্ধ দেখতে পারি’।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও এক্সে (সাবেক টুইটার) এই চুক্তি প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, সারা বিশ্ব গাজায় অনেক দুর্ভোগ এবং ধ্বংস প্রত্যক্ষ করছে। এখন এটি থেকে যাওয়ার সময়।
তিনি আরও বলেন, আমি প্রেসিডেন্ট বাইডেনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। যুদ্ধবিরতি, জিম্মিদের মুক্তি ও মধ্যপ্রাচ্যে শেষ পর্যন্ত একটি টেকসই শান্তির জন্য এই সুযোগটি কাজে লাগাতে সকল পক্ষকে উৎসাহিত করি।
বাইডেন নিজেই তার বক্তৃতায় স্বীকার করেছেন, এই চুক্তির প্রথম ও দ্বিতীয় দফার মধ্যে সমঝোতা কঠিন হতে পারে।
কয়েকদিন আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি চুক্তির অংশ হিসাবে যুদ্ধ বন্ধে রাজি নন বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। এখন নতুন করে যুদ্ধ বন্ধে প্রেসিডেন্ট বাইডেনের এই প্রস্তাবনাকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
আগে যুদ্ধবিরতি নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও সেগুলো খুব একটা কাজে দেয়নি। বর্তমানে যুদ্ধবিরতির জন্য এই চুক্তি হামাসকে আলোচনায় ফিরিয়ে আনার জন্য করা হচ্ছে এবং এরই মধ্যে হামাস এই প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে। এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি হামাসের অন্যতম দাবি।
এই চুক্তির তৃতীয় দফায় হয়তো দেখা যাবে যে কোনো মৃত ইসরায়েলি জিম্মিদের দেহাবশেষ ফিরিয়ে আনা। এর পাশাপাশি বাড়িঘর, স্কুল ও হাসপাতাল পুনর্নির্মাণের জন্য মার্কিন ও আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে পুনর্গঠন পরিকল্পনা।
বাইডেন তার বক্তব্যে আরও স্বীকার করেছেন যে, হয়তো কিছু ইসরায়েলি এবং ইসরায়েল সরকারের কর্মকর্তারা এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘যতই চাপ আসুক আমি ইসরায়েলের নেতৃত্বকে এই চুক্তির পক্ষে থাকার আহবান জানাচ্ছি’।
ইসরায়েলি নাগরিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমরা এই মুহূর্তটিকে হারাতে পারি না।
বাইডেন আরও বলেন, ৭ অক্টোবর হামাস যেরকম শক্তি নিয়ে হামলা চালিয়েছিলে, সে রকম শক্তি বা ওরকম হামলা চালানোর মতো সেই সামর্থ্য এখন আর তাদের নেই। এটিকে যুদ্ধ বন্ধের একটি সংকেত হিসেবেই দেখছে ওয়াশিংটন।
এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেছিলেন, সমস্ত জিম্মির মুক্তি, হামাসের সামরিক ও শাসন ক্ষমতা নির্মূল না করা পর্যন্ত যুদ্ধ শেষ হবে না।
এদিকে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সমস্ত্র গোষ্ঠী হামাস বলেছে, তারা এই প্রস্তাবটিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে।
হামাসের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে তারা স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, গাজা থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহার, পুনর্গঠন এবং বন্দি বিনিময়ের আহ্বানের কারণেই এই প্রস্তাবটিকে ‘ইতিবাচকভাবে’ দেখছে। তবে শর্ত একটিই, সেটি হলো ইসরায়েল যেন তার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে।
এই আলোচনার সাথে যুক্ত আরেক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা যিনি ইসরায়েলের নতুন প্রস্তাবটিকে দেখছেন। তিনি বলেন, নথিতে এমন গ্যারান্টি নেই যে যুদ্ধ শেষে গাজা থেকে ইসরায়েলি সৈন্যদের পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হবে।
এই প্রস্তাবটি কাতারভিত্তিক মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে হামাসের কাছে পাঠানো হয়েছে।
গাজায় ক্রমবর্ধমান বেসামরিক মানুষের হতাহতের পর ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন নিয়ে কঠোর সমালোচনা হয় সারা বিশ্বে। এরপরই সমালোচনার মুখে যুদ্ধ বন্ধে দুই পক্ষকেই আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছিলেন প্রেসিডেন্ট বাইডেন।
উল্লেখ্য, গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাস। এদিন ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় ইরেজ সীমান্ত দিয়ে ইসরায়েলে প্রবেশ করে অতর্কিত হামলা চালায় হামাস যোদ্ধারা। পাশাপাশি ইসরায়েল থেকে প্রায় ২৪০ জনকে জিম্মি হিসেবে গাজায় নিয়ে যায় হামাস।
তারপর ওই দিন থেকেই গাজায় অভিযান শুরু করে ইসরায়েলি বিমানবাহিনী। পরে ২৮ অক্টোবর থেকে অভিযানে যোগ দেয় স্থল বাহিনীও। চার মাসের বেশি সময় ধরে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ৩৬ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশেরও বেশি নারী ও শিশু। এছাড়া আহত হয়েছেন ৮১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি।
গত বছরের নভেম্বরে কাতারের মধ্যস্থতায় প্রথমবারের মতো যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয় হামাস ও ইসরায়েল। এক সপ্তাহব্যাপী যুদ্ধবিরতিতে ইসরায়েলি কারাগার থেকে ২৪০ ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে ৭১ জন মহিলা এবং ১৬৯টি শিশু রয়েছে। বিনিময়ে ২৪ বিদেশিসহ মোট ১০৫ জনকে মুক্তি দিয়েছে হামাস। হামাসের কাছে এখনো প্রায় ১৩০ জন জিম্মি রয়েছে বলে দাবি ইসরায়েলের।
সূত্র: বিবিসি